অনেক রক্তপাতের সাক্ষী, শ্রীলংকা থেকে ঘুরে এসে-(১)
কত নামেই না ডাকা হতো এক সময় ভারতের দক্ষিণে ভারত মহাসাগরের তীরে অবস্থিত এই দ্বীপটিকে। আজকে যা শ্রীলংকা হিসাবে পরিচিত তার এক সময়কার নাম ছিল কেবল ‘লংকা’। ছিল আর এক নাম লংকাদ্বীপ। শ্রীলংকার অপরূপ সৌন্দর্য একে আদর করে ডাকা হতো ভারত মহাসাগরের সবুজ মুক্ত। সবুজে সবুজে ঘেরা এই দেশটির সৌন্দর্য আর সম্পদের লোভে এই দেশটিকে সমানে ভোগ করেছে, ডাচ, ইংরেজ আর পর্তুগিজরা। ১৯৪৮ সালে স্বাধীন হবার আগতক শ্রীলংকা ছিল বৃটিশ শাসনাধীন। তবে বহিরাগতদের ক্ষমতা দখলের ইতিহাস তারও আগ থেকে। প্রথমে এই দেশটি দখলে নেয় পর্তুগিজরা ১৫০৫ সালে। সে দখল চলে ১৬৫৮ তক্। এর পর আসে ডাচ (ওলন্দাজ)। মূলত শ্রীলংকার হরেক রকমের মশলা, হাতির বাণিজ্যের কারণেই ডাচদের এই দেশে আসা বলে জানা যায়। সহজ নৌ-চলাচলের জন্যে তারা খনন করে খাল। ১৭৯৬ সালে শ্রীলংকা আসে বৃটিশদের হাতে। ডাচদের কাজ থেকে তারা দখলে নেয় প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর এই বৌদ্ধ অধ্যুষিত দেশটিকে এবং ১৮০২ শ্রীলংকা বৃটিশ রানীর শাসনাধীন একটি ঔপনিবেশে পরিণত হয়। সে শাসন চলে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত। ভাবতে অবাক লাগে সে সময়কার দিনে যখন আজকের এই প্রযুক্তি ছিল না কী করে এই উত্তাল সাগর-মহাসাগর পাড়ি দিয়ে ইংরেজ, পর্তুগিজ, স্পেনীয়রা পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত গেছে। অজানা দেশ নিজ দখলে নিয়ে শাসন-শোষণ দুইই করেছে। গেল সপ্তাহে দিন কয়েকের জন্যে শ্রীলংকা গেলে টের পাই ইউরোপীয়দের পদশব্দ। এখানে চোখে পড়ে অই সময়কার শাসনের ছোঁয়া। কিছু কিছু এলাকার বাড়িগুলো পর্তুগিজ কিংবা ইংরেজি ধাচের। বন্দরনায়ক বিমান বন্দর থেকে কলম্বো শহরে হোটেল যাবার ৪৫ কিলোমিটার পথে চোখে পড়ে রাস্তার ধারে ক্রিকেট খেলে চলা ছেলেদের। সারি সারি নারকেল গাছ, তাতে ঝুলে আছে অনেকটা হলুদ রং-এর নারকেল। দেখে মনে হয় পেঁকে গেছে। কিন্তু না। কেননা দিন দুয়েক পর নিগমম্বর(নামটা মনে রাখা সহজ, কেননা নামটা মনে এলেই ‘দিগম্বর’ শব্দ মনে পড়ে, হাসি নিজে নিজে) নামক শহরে ‘গামপা’ এলাকায় ইউরোপীয় মাইগ্রেন্টস পরিবারের সদস্যের সাথে দেখা করতে গেলে সেখানে গাছ থেকে পেরে যা খেতে দেওয়া হয় তা রং এর কারণে নারকেল মনে হলেও দেখি কাঁচা, কচি ডাব দেখে কে বলবে ‘কচি’। দেখতে আক্ষরিক অর্থে বুড়ো। নারকেল গাছের এমন ছড়াছড়ি আর কোন দেশে আছে বলে মনে হয় না। সর্বত্র। এমন একটি ঘর নেই, বাগান নেই যেখানে নারকেল গাছ নেই। গাড়ি পথের দুপাশের প্রতিটি বাড়িতে নারকেল গাছ, সমুদ্রের ধারে, এমন কি ফাইভ স্টার হোটেলের সামনে, পেছনে, পাশে, এমন কি হোটেলের সুইমিং পুল লাগোয়াও নারকেল গাছ। আমার তো মনে হয় শ্রীলংকার নাম শ্রী নারকেল হলেই মানানসই হতো।
শ্রীলংকা যাব কি যাব না এই দোটানায় ছিলাম। কেননা দেশ থেকে মাকে চিরতরে বিদায় দিয়ে সবে হল্যাণ্ড ফিরেছি। মা গত হয়েছে ১৩ জানুয়ারি। শ্রীলংকার প্রোগ্রাম আগ থেকে ঠিক হয়ে থাকা। তারিখটা আমিই উদ্যোক্তাদের আগ বাড়িয়ে ঠিক করেছিলাম এই ভেবে যে গত বিশ বছর প্রবাসে থাকাকালীন ঢাকার একুশে ফেব্রুয়ারির মধ্যপ্রহরে শহীদ মিনারে যাওয়া হয়নি। মনে মনে ঠিক করে রেখেছিলাম এবার যাব। সেই চিন্তা মাথায় নিয়ে কলম্বোর সেমিনার ১৬ ফেব্রুয়ারি করতে অনুরোধ জানাই। ঠিক হলো কলম্বো থেকে ১৯ তারিখ সরাসরি ঢাকা যাব। অসুস্থ মাকে দেখে আসবো, একুশও। তেইশ তারিখ হল্যাণ্ড ফিরবো। কিন্তু ইতিমধ্যে মা গত হলেন। সব ওলট-পালট হয়ে গেল। কলম্বো শেষতক্ গেলেও দেশে যাবার আগ্রহ মিইয়ে গেল। যাওয়া হলো না। শ্রীলংকা থেকে দোহা, লন্ডন হয়ে ফিরে এলাম হল্যাণ্ড।
শ্রীলংকা গিয়েছিলাম ‘বাসুগ’-এর রেমিটেন্স প্রকল্পের অধীনে শ্রীলংকার পাটনার সংগঠন আয়োজিত সেমিনারে যোগদান ও ‘প্রশিক্ষকদের জন্য প্রশিক্ষণ’ পর্যবেক্ষণ করতে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ইউনাইটেড নেশন-র জয়েন্ট মাইগ্রেশন এন্ড ডেভলপমেন্ট ইনিসিয়েটিভ-র আওতায় শ্রীলংকার প্রতিষ্ঠান ‘সিডস’ আয়োজন করে এই সেমিনারের। তাতে ঢাকা থেকে যোগ দেয় ইনাফি পরিচালক, আতিকুন নবী। ইনাফির তিন কর্মকর্তা-রাশেদ আল হাসান, রাশেদ উন নবী ও জোবায়দা। সবাই উঠেছি একই হোটেলে। ওরা কলম্বো পৌঁছে গেছে আমার পৌঁছার একদিন আগে। শ্রীলংকায় এই প্রথম যাওয়া। তাই দেশটিকে কাজের ফাঁকে সুযোগ হলে দেখার ইচ্ছে ছিল প্রবল। কথা ছিল এয়ারপোটে হোটেল থেকে লোক আসবে রিসিভ করতে। ইমিগ্রেশনে ভিড় নেই। ইউরোপীয় পাসপোর্টধারীদের ভিসা লাগে না। কিন্তু হেগ্ শহরে শ্রীলংকা দুতাবাস বললে, যেহেতু সেমিনারে যাচ্ছেন তাই এটা ‘বিজনেস’ ট্রিপ। ফি দিতে হবে ৫০ ইউরো। ইমিগ্রেশন পেরিয়ে বের হতেই গায়ে এসে লাগলো গরম। ইউরোপে তখন মাইনাস এক/ দুই। শ্রীলংকায় ২৭ ডিগ্রি। মিটিং পয়েন্টে বেশ কয়েকজনকে দেখলাম নাম ঝুলিয়ে অপেক্ষা করেছে। তেমনি কয়েক জনের সামনে গিয়ে নিজের নাম দেখতে না পেয়ে একটু বিরক্তই হলাম। হোটেলে ফোন করতে বললে, লোক গেছে। একটু অপেক্ষা করুন, পৌঁছে যাবে। ক্ষণিক বাদে দেখি লবিতে বসা এক লোক হাতে নাম সম্বলিত বোর্ডটি নিয়ে এগিয়ে আসছে। বাইরে গাড়ি দাঁড়িয়ে। তখন দুপুর প্রায় একটা। গাড়ি এগিয়ে চলে কলম্বোর দিকে।
চোখে পড়ে ভারত মহাসাগর। এক সময়কার বৌদ্ধ ধর্ম ও সংস্কৃতির ধারক-বাহক ছিল শ্রীলংকা। হোটেলে যাবার পথে লক্ষ্য করি বিভিন্ন মোড়ে এমনকি কোন কোন বড় ভবনের প্রবেশ মুখে কাঁচ দিয়ে ঘেরা বিশাল, মাঝারি সাইজের বুদ্ধ মূর্তি। কোথাও কোথাও যীশু খৃস্টের মূর্তি চোখে পড়ে। গোটা জনসংখ্যার ৬৯.১% বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী (থেরবাদী), ৭.১% হিন্দু (এরা মূলতঃ তামিল) ৭.৬% মুসলমান (সুন্নী), ৬.২% খৃস্টান ও বাকি প্রায় ১০% সম্পর্কে সঠিক কোন তথ্য জানা নেই। (জরিপ ২০০১ মতে)। উত্তরে তামিল অধীন এলাকায় কোন সরকারি জরীপ সে সময় চালানো যায়নি বিধায় সেখানে বসবাসরত তামিলদের সংখ্যা এতে নেই। মজার ব্যাপার হলো কলম্বো শ্রীলংকা রাজধানী হিসেবে পরিচিত হলেও মূলত ১৯৮২ সাল থেকে ‘শ্রী জয়বর্ধন কোট’ নামক শহর হলো এর রাজধানী। কলম্বোর ডিসট্রিকের পূর্ব দিকে এই শহর অবস্থিত।
বৌদ্ধ ধর্মের প্রসংগ এলেই প্রথমে যে কথাটি সবার মনে পড়ে তা হলো এ শান্তির ধর্ম। কিন্তু অবাক করা ব্যাপার এ বৌদ্ধ অধ্যুষিত দেশটি অনেক রক্তপাতের সাক্ষী। গৃহযুদ্ধে বছরের পর বছর ঝরেছে রক্ত। সিংহলী আর তামিল একে অন্যের বিরুদ্ধে ধরেছে অস্ত্র। শান্তির বাণী যেন নিভৃতে কেঁদে ফিরেছে এ দেশে। এ সংঘাতের শুরু ভাষাকে কেন্দ্র করে। ১৯৪৮ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি শ্রীলংকা স্বাধীন হবার পর ১৯৫০ সালে সিংহলীকে সরকারি ভাষা হিসেবে ঘোষণা দেয়া হয়। পাশাপাশি রাষ্ট্রপ্রধান বন্দরনায়ক তামিল ভাষাকে কিছু কিছু এলাকায় সরকারি পর্যায়ে রাখার ঘোষণা দেন। আর সেটাই হলো তার কাল। জনৈক উগ্র সিংহলীর হাতে নিহত হন প্রেসিডেন্ট বন্দরনায়ক। তার স্থলাভিষিক্ত হন তার স্ত্রী শ্রীমাভো বন্দরনায়ক। তিনিই ছিলেন শ্রীলংকার প্রথম মহিলা রাষ্ট্রপ্রধান। একই পরিবারের আর এক সদস্যা শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তিনি ছিলেন চন্দ্রিকা বন্দরনায়ক কুমারাতুংগা। তার স্বামীও রাজনৈতিক কারণে নিহত হন। ২০০৫ সাল পর্যন্ত কুমারাতুংগা দেশ শাসন করেন।
এক সকালে বেড়াতে বের হলে গাড়িতে পাশে বসা আধ বয়েসী জয়সিনহাকে জিজ্ঞাসা করি, ভারতের প্রতি শ্রীলংকার সাধারণ জনগণের মনোভাব কেমন? বৈরি কিনা? মাঝারি সাইজের মাইক্রোবাস ড্রাইভ করতে করতে জয়সিনহা বললেন না, মনোভাব খারাপ নয়। তবে স্বাভাবিক কারণে তামিলরা সন্তুষ্ট নয়। কেননা ভারত তাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। বিশেষ করে তামিল সুইসাইড স্কোয়াডের এক সদস্য রাজীব গান্ধীকে আত্মঘাতী বোমায় হত্যা করলে তামিল গেরিলাদের প্রতি তাদের নীতির পরিবর্তন ঘটে। এক সময়কার সিনিয়র ব্যাংকার জয়সিনহা আমায় নিয়ে যাচ্ছিল কেলানিয়া বৌদ্ধ মন্দিরে। কলম্বো থেকে সামান্য দূরে। যে অনুষ্ঠানে আসা অই মূল অনুষ্ঠানের ‘মডারেটর’ ছিলেন তিনি। দুই সন্তানের জনক জয়সিনহা বছর কয়েক আগে ব্যাংকের চাকরি থেকে অবসর নিয়ে ‘কনসালটেন্ট’ হিসেবে যোগ দিয়েছে ‘সিডস’-এ। তার স্ত্রীও ব্যাংকার। তিনিও অবসর নিয়েছেন চাকরি থেকে। তাদের দু ছেলের একজন চাকরি করে শ্রীলংকার বিশ্ব ব্যাংকে, অন্যজন যুক্তরাষ্ট্রে। সেমিনারে বক্তব্য রেখে পাশে এসে বসতেই বললেন, তোমার বক্তৃতায় শুনলাম তুমি বৌদ্ধ। তাহলে তো তোমাকে কাল এক জায়গায় নিয়ে যেতে হয়। সেখানে গেলে তোমার ভাল লাগবে। আমার কোন উত্তরের অপেক্ষা না করে বললেন, কাল সকাল ৬টায় তোমার হোটেলে গাড়ি নিয়ে আসবো, তারপর একসাথে যাওয়া যাবে। গাড়ি পথে মিনিট চল্লিশের দূরত্ব। ইচ্ছে ছিল শ্রীলংকায় যখন এসেছি কোন তীর্থস্থানে বেরিয়ে যাব। ইচ্ছে ছিল কিন্তু অই অত সকালে ঘুম থেকে উঠা- সেটাই সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেননা পরদিন সকাল সাড়ে দশটায় যেতে হবে সিডস অফিসে ‘ট্রেনিং ফর দ্য ট্রেইনার্স’ কেমন হচ্ছে তা দেখতে। শেষে ঠিক হলো জয়সিনহা হোটেলে আসবে ঠিক আটটায়। সেখান থেকে কেলানিয়া বৌদ্ধ মন্দির। চলেছি আর পথে পথে চোখে পড়ে বুদ্ধ মূর্তি। আর ভাবি শান্তির ধর্ম বৌদ্ধ ধর্মের এই দেশটি কত না রক্তপাতের সাক্ষী। ১৯৮৭ সালে ভারতের মধ্যস্থতায় শ্রীলংকা সেনাবাহিনী ও তামিল গেরিলাদের মধ্যে যুদ্ধ বিরতি হয়েছিল। ভারত তার নিজস্ব সেনাবাহিনীও পাঠিয়েছিল যদিও বা ১৯৯০ সালে তা ফিরিয়ে নেয়। কেননা তামিলদের নিরস্ত্র করানো রাজি করানো যায়নি। দীর্ঘ ২০ বছর সশস্ত্র সংঘর্ষের পর নরওয়ের মধ্যস্থতায় ২০০২ সালে দুই পক্ষের মধ্যে ‘যুদ্ধ বিরতি’ চুক্তি স্বাক্ষর হলেও তা বেশিদিন টেকেনি। এয়ারপোর্ট থেকে হোটেলে যাবার পথে প্রায় সবখানে চোখে পড়ে বর্তমান প্রেসিডেন্টের বিশাল সাইজের ছবি। কিছুদিন আগেই হয়ে গেল নির্বাচন। তাতে তিনি জয়ী হয়েছেন যদিও অভিযোগ রয়েছে কারচুপির। কোনটা সত্যি জানিনে কেননা হেরে গেলে কারচুপির অভিযোগ আনা এই অঞ্চলের দেশগুলিতে একটা নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। চলেছি আর অবাক হয়ে দেখছি কী সুন্দর গাড়িগুলো কেমন নিয়ম মেনে চলছে। কোথাও দু-সারি, কোথাও তিন, কোথায়ও বা এক। নিয়ন বাতিগুলিকে কী সুন্দর মেনে চলেছে। প্রতিটি রাস্তায় ট্রাফিক পয়েন্টে ট্রাফিক পুলিশ। রাস্তাঘাট আহামরি তেমন কিছু না হলেও গাড়ি এগিয়ে চলেছে ভিড় সত্ত্বেও। বাংলাদেশের এই আমি দেখি আর অবাক হই। স্টিয়ারিং হাতে ধরা জয়সিনহাকে বলি, তোমাদের এই যে আইন মেনে চলা তাকে শ্রদ্ধা জানাই। আমরা এগিয়ে চলেছি কেলানিয়া বৌদ্ধ মন্দিরের দিকে। প্রবাদ আছে স্বয়ং গৌতম বুদ্ধ তিনবার এই মন্দিরে আসেন এবং ধর্ম দেশনা করেন। (আগামীতে সমাপ্য)।
কল্যাণ রাষ্ট্র গঠনে জনপ্রতিনিধি বনাম আমলাদের ক্ষমতার দ্বন্দ্বের অবসান হওয়া বাঞ্ছনীয়
- চট্টগ্রামের উন্নয়নে ফেডারেল রাষ্ট্রকাঠামোর বিকল্প নেই

