বিদ্যুৎ-পানি-গ্যাস সরবরাহ প্রসঙ্গ
গ্রীষ্মকালের আগমন ঘটবার পূর্বেই চট্টগ্রামে বিদ্যুৎ সংকট তীব্রতর রূপ ধারণ করেছে। দিনে-রাতে সমানে চলছে লোডশেডিং। এই লোডশেডিং কোন কোন এলাকায় চলছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। দৈনিক আজাদীতে সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে চলমান পরিস্থিতির উপর আলোকপাত করে বলা হয়েছে যে, নগরীর পরিস্থিতি নাজুক হয়ে পড়েছে বিদ্যুৎ আর পানি সংকটে। কাপ্তাই হ্রদের পানি দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। দেশে গ্যাসের মওজুদও কমছে। কেবল লোডশেডিংই বাড়ছে। গরমে বিদ্যুৎ সংকটের পাশাপাশি পানির অভাব পরিস্থিতিকে আরো নাজুক করে তুলেছে। পরিস্থিতি যেখানে চাহিদার সাথে সঙ্গতি রেখে সামাল দেবার কথা, সেখানে চট্টগ্রামে বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রধান উৎস কাপ্তাই পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অবস্থাই নড়বড়ে। ১৮ মার্চ দৈনিক আজাদীতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, পানি সংকট আর যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে কাপ্তাই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদনে ভয়াবহ বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। কাপ্তাই হ্রদে পানি না থাকায় এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পাঁচটি ইউনিটের মধ্যে সচল থাকা দুটো ইউনিটও দিনের বেলা পুরোপুরি বন্ধ রাখা হচ্ছে। যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বন্ধ আরো দুটো ইউনিট। অতএব, চালু আছে মাত্র একটি। এর ফলে ২৩০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে পিক আওয়ারে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১২২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। দৈনিক ১১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ঘাটতি পূরণের জন্য বিকল্প কোন ব্যবস্থা চট্টগ্রামে নেই। বর্তমানে কাপ্তাই হ্রদে ৯০ থেকে ৯২ এম এস এল পানি থাকার কথা থাকলেও দিবাভাগে ৮১ এম এস এল-এর বেশী পানি পাওয়া যায়নি। দিবাভাগে চালু রাখা হয় একটি ইউনিট। রাতের বেলা তিনটি ইউনিট সচল রাখলেও বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ১২০ থেকে ১২২ মেগাওয়াট। খুব সহসা বৃষ্টিপাত না হলে এই কেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে বলে আশংকা করা হচ্ছে।
কেবল কাপ্তাই বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র নয়, চট্টগ্রামের অন্যান্য বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলোতেও স্বাভাবিক উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এর ফলে বিদ্যুৎ খাতের পরিস্থিতি বর্তমানে নুন আনতে পান্তা ফুরানোর মতো অবস্থায় দাঁড়িয়েছে। বিদ্যুৎ সংকটের কারণে সহস্রাধিক ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প কারখানা পুরোপুরি বন্ধ থাকছে বলে খবরে বলা হয়েছে। বিদ্যুৎ সংকট জনিত লোডশেডিং এর ফলে অর্থনৈতিক সংকট দ্রুত এগিয়ে আসছে বলে আশংকা করা হচ্ছে। ৪২০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন রাউজান তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের একটি ইউনিটও পুরোদমে চালানো যাচ্ছে না। পিডিবির প্রায় ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ মাত্র ৩০ মিলিয়ন ঘনফুট। এই গ্যাস দিয়ে রাউজান তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের একটি ইউনিট এবং শিকলবাহা তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রে আংশিক উৎপাদন চলছে। ১৭ মার্চ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে পরিবেশিত বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্পর্কিত তথ্যে দেখা যায় যে রাউজান তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ২১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা সম্পন্ন ইউনিটটি সম্পূর্ণ বন্ধ। শিকলবাহা ৬০ মেগাওয়াট তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে পাওয়া গেছে মাত্র ৪০ মেগাওয়াট। ২৪ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন বার্জ মাউন্টেড বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি গ্যাসের অভাবে বন্ধ। কাপ্তাই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অবস্থা পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে। পাহাড়ে ভারী বৃষ্টি না হলে এর অবস্থার উন্নতির কোন সম্ভাবনা নেই। বেসরকারী বিদ্যুৎ কেন্দ্র শিকলবাহা রেন্টাল থেকে ৩০ মেগাওয়াট এবং সীতাকুণ্ডের রিজেন্ট পাওয়ার থেকে ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া গেছে। সব মিলিয়ে ঐ তারিখে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ ২৯০ মেগাওয়াট। ন্যাশনাল গ্রীড থেকে দেওয়া হয় ৯০ মেগাওয়াট। অর্থাৎ সর্বমোট ৩৮০ মেগাওয়াট। অথচ চট্টগ্রামের চাহিদা ৬০০ মেগাওয়াটের বেশী। অতএব পরিস্থিতি সহজেই অনুমেয়। বিদ্যুৎ বিভাগের দায়িত্বশীল কর্মকর্তার বরাত দিয়ে প্রকাশিত খবরে বলা হয় যে, তিনি নিজেই এ পরিস্থিতিতে উদ্বিগ্ন। অবস্থার উন্নতি কখন হবে বা আদৌ হবে কিনা, তা নিয়েও রয়েছে ঘোরতর সংশয়। বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিস্থিতির অবনতির সাথে সাথে পানি সরবরাহ পরিস্থিতিরও অবনতি ঘটেছে। ওয়াসা ইঞ্ঝিত পরিমাণ পানি উৎপাদন করতে পারছেনা। চাহিদার এক তৃতীয়াংশ পরিমাণ পানিও পাওয়া যাচ্ছে না। এ অবস্থায় চট্টগ্রাম ওয়াসা কর্তৃপক্ষ পানি রেশনিং করে পরিস্থিতি সামাল দেবার চেষ্টা করছে।
বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানি সংকটে বিপর্যস্ত চট্টগ্রামে জনজীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। শিল্প কারখানা, ঘর-গেরস্থালী সর্বত্র হাহাকার চলছে। আলো নেই, পানি নেই, গ্যাস নেই। কোনটা কতো পরিমাণ কখন পাওয়া যাবে, তার কোন নিশ্চয়তা নেই। ফলে উদ্বেগাকুল শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা বিরাজ করছে। এদিকে সরকারের প্রচেষ্টারও অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে না। গত ১৬ মার্চ ১০টি নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য ৭,২০৩ কোটি টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে একনেক বৈঠকে।
এ প্রকল্পের আওতায় ডিজেল বা ফার্নেস ফুয়েল চালিত ১০টি বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা হবে। এই দশটি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মধ্যে দুটো স্থাপিত হবে চট্টগ্রামের হাটহাজারী ও দোহাজারীতে। এ সংবাদ আশাপ্রদ হলেও এখনো পরিকল্পনার কাগজে সীমাবদ্ধ। কবে কাজ শুরু হবে, কবে শেষ হবে, তা অনিশ্চিত। বর্তমান মুহূর্তের বিপর্যস্ত অবস্থা থেকে উত্তরণের আলো দেখার অপেক্ষায় আছেন চট্টগ্রামবাসী তথা দেশবাসী।

