শিরোনাম : এইচ এস সি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল জানতে ক্লিক করুন এবং চট্টগ্রাম বোর্ডের ওয়েবসাইট চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডে পাসের হার ৬১.০৯, জিপিএ-৫ পেয়েছে ১৩৯১ Stop button Start button

 

  ফেইসবুকে ভক্ত হোন টুইটারে ভক্ত হোন গুগল প্লাস এ ভক্ত হোন। সাহায্য বিজ্ঞাপন শুল্ক পাঠক প্রতিক্রিয়া রেজিস্ট্রেশন

 

১২ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার ২০১৭ খ্রিঃ ২৯ পৌষ ১৪২৩ সাল ১৩ রবিউস সানি ১৪৩৮
    আজকের দিনে কোন ফিচার পাতা সংরক্ষিত নেই।
চট্রগ্রাম
আজকের দিনের তাপমাএা সংরক্ষিত নেই।

আজকে অনলাইন জরিপের জন্য কোন প্রশ্ন সংরক্ষিত নেই।
প্রথম পাতা   বিস্তারিত  

সময় বেড়েছে, অনুষ্ঠানের মান বেড়েছে কি

রাশেদ পারভেজ

যাত্রা শুরুর প্রায় ২০ বছর পর সম্প্রতি বাংলাদেশ টেলিভিশন চট্টগ্রাম কেন্দ্র স্যাটেলাইট চ্যানেল হিসেবে ৬ ঘণ্টা সম্প্রচার শুরু করেছে। ফলে এখন থেকে চট্টগ্রাম কেন্দ্রের অনুষ্ঠান সারাবিশ্বে বিকেল ৫টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত সম্প্রচারিত হচ্ছে। তবে চট্টগ্রামের নিজস্ব সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে বৃহৎ পরিসরে তুলে ধরতে চট্টগ্রাম কেন্দ্রের ৬ ঘণ্টা সম্প্রচার শুরু হলেও ঢাকা কেন্দ্রের প্রচারিত পুরনো অনুষ্ঠান প্রচার, অতিমাত্রায় আলোচনা অনুষ্ঠান, বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানের অনুপস্থিতি, পুনঃপ্রচার নির্ভরতা, জোড়াতালি দিয়ে অনুষ্ঠান প্রচার, নিম্নমানের সাউন্ড ও ভিডিও কোয়ালিটি, একই সেটে একাধিক অনুষ্ঠান নির্মাণ এবং গুটিকয়েক চেহারাকে প্রায় সকল অনুষ্ঠানের আলোচক, উপস্থাপক ও প্রযোজক রূপে উপস্থাপনের কারণে সিটিভি’র ৬ ঘণ্টা সম্প্রচার এবং পর্যায়ক্রমে ২৪ ঘণ্টার পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল চ্যানেল হিসেবে আত্মপ্রকাশের সম্ভাবনা এবং সক্ষমতা প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সংশ্লিষ্টরা। এতে বেসরকারি টেলিভিশনের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার পরিবর্তে চট্টগ্রাম কেন্দ্রের প্রতি দর্শকদের নেতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি হবে বলেও দাবি তাদের।

এদিকে গত ৩১ ডিসেম্বর থেকে ৬ ঘণ্টার যাত্রা শুরুর পর গত দুই সপ্তাহের অনুষ্ঠান পর্যালোচনা করে দেখা যায়, দিনের বেশিরভাগ অংশজুড়েই থাকে আলোচনা অনুষ্ঠান। যেখানে একই মুখগুলোকে বারবার ঘুরে-ফিরে দেখা যায়। সর্বশেষ গত ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস উপলক্ষে কেবল আলোচনা অনুষ্ঠান হয়েছে ৫/৬টি। বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান বলতে কিছুই নেই। নাটক, রিয়েলিটি শো কিংবা চট্টগ্রামের কৃষ্টি ও সম্ভাবনা তুলে ধরার মত অনুষ্ঠানের অভাব ছিল চোখে পড়ার মত। গানের অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে কয়েকটা অনুষ্ঠান থেকে এক-দুটি গান নিয়ে জোড়াতালি দিয়ে নতুন অনুষ্ঠান হিসেবে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে কতিপয় মানসম্পন্ন অনুষ্ঠান প্রচার হলেও ঢাকা কেন্দ্রে প্রচারিত পুরনো অনুষ্ঠানের সম্প্রচার দর্শকদের সিটিভি’র প্রতি অনাগ্রহ তৈরি করছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সঙ্গীতশিল্পী আবদুল মান্নান রানা বলেন, টেলিভিশন কিন্তু শিল্পী-কলাকৌশলীদের শেখার জায়গা না। দর্শকরা শিল্পীদের অনুশীলন দেখতে নয়, দক্ষ শিল্পীদের তৈরিকৃত অনুষ্ঠানের উপস্থাপন দেখতেই টিভি দেখেন। কিন্তু সিটিভি’র বর্তমান অনুষ্ঠান দেখলে চট্টগ্রাম সম্পর্কে মানুষের নেতিবাচক ধারণা তৈরি হবে। দিনে ৬টা অনুষ্ঠানের মধ্যে ৪টার উপস্থাপনায় কিংবা আলোচক হিসেবে একই ব্যক্তিকে দেখা যায়। দক্ষ ও সৃজনশীল লোকের অভাব হলে সেখানে ভালো ও মানসম্পন্ন অনুষ্ঠান প্রত্যাশা করা যায় না উল্লেখ করে তিনি বলেন, আগে চট্টগ্রাম কেন্দ্রের অনুষ্ঠান দেখতো দেশের অভ্যন্তরে, এখন সেটা বহির্বিশ্ব দেখছে। সেক্ষেত্রে চট্টগ্রামকে প্রতিনিধিত্ব করে তোলার ক্ষেত্রে সিটিভি দশভাগের একভাগও ভূমিকা পালন করতে পারছে না।

সংস্কৃতিকর্মী আহমেদ ইকবাল হায়দার বলেন, সিটিভি’র প্রোগ্রাম অনেকটা ক্লাবের প্রোগ্রামের মত মনে হয়। অথচ চট্টগ্রামকে রিপ্রেজেন্ট করার জন্যই সিটিভি’র যাত্রা। কিন্তু সেখানে চট্টগ্রামের শিল্প, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য নিয়ে কোন অনুষ্ঠানই হচ্ছে না। সিটিভি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে ইকবাল হায়দার বলেন, এখানে প্রত্যেকে ব্যক্তিস্বার্থ নিয়েই আছেন। যে কারণে চট্টগ্রামের গুণী শিল্পীরা সিটিভি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন।

সঙ্গীত পরিচালক ও সঙ্গীতশিল্পী ফরিদ বঙ্গবাসী বলেন, ঢাকা কেন্দ্রের প্রচারিত অনুষ্ঠান দিয়ে যদি সিটিভি চালাতে হয় তবে ৬ ঘণ্টা সম্প্রচার পুরোটাই অর্থহীন। তিনি বলেন, বিটিভি’র নিয়মানুযায়ী তালিকাভুক্ত শিল্পীরা এমনকি বিশেষ ক্যাটাগরির শিল্পীরা পর্যন্ত প্রতিমাসে ৩টার বেশি অনুষ্ঠান করতে পারেন না। কিন্তু তালিকাভুক্ত শিল্পীদের বাদ দিয়ে বর্তমানে অনিয়মিত ও অনভিজ্ঞ লোকেদের অনুষ্ঠান দেখানো হচ্ছে। যেখানে অনুষ্ঠানের ন্নিমান, একগেঁয়ে ও আনাড়িপনার স্বাক্ষর বহন করছে। এতে সিটিভি’র প্রতি দর্শকদের বিরক্তি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। এখন সিটিভি গুটিকয়েক প্রযোজক, শিল্পী, আলোচক কিংবা উপস্থাপকেই সীমাবদ্ধ বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ। তরা বলছেন, ৬ ঘণ্টা সম্প্রচারের যাবতীয় রসদ সাবেক মহাপরিচালক (ডিজি) আসাদ মান্নান ও সাবেক মহাব্যবস্থাপক (জিএম) জ্যাঁ নেসার ওসমানের সময়কালে জমা ছিল। কিন্তু বর্তমান জিএম কী উন্নয়ন সাধন করেছেন?

এ প্রসঙ্গে সিটিভি কেন্দ্রের জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) মনোজ সেনগুপ্তের কাছে জানতে চাইলে তিনি টেলিফোনে এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘আপনি টেলিভিশন দেখেন না?’ জবাবে অনুষ্ঠান দেখা হয় এবং সে প্রসঙ্গেই কথা বলার অভিপ্রায় ব্যক্ত করা হলে মনোজ সেনগুপ্ত বলেন, ‘আপনি সরাসরি চট্টগ্রাম কেন্দ্রে আসেন, তখন কথা হবে। আমি টেলিফোনে কথা বলি না।’

জানা গেছে, ১৯৯৬ সালের ১৯ ডিসেম্বর যাত্রার শুরু থেকে বিটিভি চট্টগ্রাম কেন্দ্রের মূল অনুষ্ঠান ছিল এক ঘণ্টার। এর প্রায় এক যুগ পর ২০০৮ সালে অনুষ্ঠানের সময় ৩০ মিনিট বেড়ে দেড় ঘণ্টায় রূপ নেয়। এই পুরো সময়টিই বিটিভির ঢাকা কেন্দ্রের অনুষ্ঠানের মাঝখানে চট্টগ্রাম কেন্দ্রের অনুষ্ঠান প্রচারিত হতো। এরপর ২০১৬ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে সিটিভি একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল টেলিভিশন কেন্দ্র হিসেবে চার ঘণ্টার স্যাটেলাইট সম্প্রচার শুরু করে। সর্বশেষ ২০১৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর থেকে ছয় ঘণ্টার স্যাটেলাইট চ্যানেল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে বিটিভি চট্টগ্রাম কেন্দ্র। তবে যে উদ্দেশ্য নিয়ে সিটিভি’র যাত্রা সেটা অর্জনে ব্যর্থ হলে প্রতিযোগিতা থেকে ছিঁটকে পড়বে বলে মত দিয়েছেন চট্টগ্রামের বিশিষ্টজনেরা।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী আজাদীকে বলেন, চট্টগ্রাম ইতিহাস, ঐতিহ্য, শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিশাল আঁধার। এ অঞ্চলের সর্বাত্মক উন্নয়ন ঘটানো এবং সেসবের প্রচারের লক্ষ্যেই চট্টগ্রাম কেন্দ্রের ৬ ঘণ্টার সম্প্রচার শুরু হয়েছে। এখানকার নিজস্ব কৃষ্টি, আঞ্চলিক, মাইজভাণ্ডারী ও মরমী গান, উপজাতীয় সংস্কৃতি, বন্দর, পর্যটন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে ঘিরে একটা স্বকীয়তা রয়েছে। যা দিয়ে চাইলে একটি স্বতন্ত্র টিভি চ্যানেল চালানো সম্ভব। সেক্ষেত্রে সবার জন্য উন্মুক্ত ও সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। তিনি বলেন, টেলিভিশন হচ্ছে বিনোদন ও তথ্য জানার স্থান। কিন্তু সেখানে যদি দর্শকের চাহিদানুযায়ী অনুষ্ঠান না থাকে সেক্ষেত্রে অন্যান্য প্রতিযোগিতা থেকে ছিঁটকে পড়বে। দর্শকরা এখন বেসরকারি টেলিভিশনের ভিড়ে বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) কিংবা সিটিভি দেখতে চায় না।

সিটিভিতে প্রয়োজনীয় চাকচিক্যের অভাব রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আজকাল বেসরকারি চ্যানেলে প্রতিযোগিতা বাড়ছে। সেজন্য সিটিভির সাউন্ড কোয়ালিটি, স্টুডিও ও কলাকুশলী থেকে শুরু করে সর্বক্ষেত্রে মান বাড়ানোর পাশাপাশি বৈচিত্র্য আনার পরামর্শ দেন। এ লক্ষ্যে একটি উপদেষ্টা কমিটি গঠন করে নিয়মিত অনুষ্ঠান তদারকি এবং মানোন্নয়নের নজর দেওয়ার তাগিদ দেন। অন্যথায় ২৪ ঘণ্টার সম্প্রচার করলেও জনগণ কাঙিক্ষত সুফল পাবে না বলে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে চবি উপাচার্য।

অন্যদিকে সমাজবিজ্ঞানী ড. অনুপম সেন বলেন, বহু আগে থেকে আমি সিটিভিতে অনুষ্ঠান করি। তবে সেখানকার অনুষ্ঠান দেখার সময় পাই না। শুনেছি সিটিভির সাবেক ও বর্তমান দুই জিএম এর মধ্যে ব্যক্তিগত সমস্যা আছে। যে কারণে সিটিভিতে কিছু জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। তবে সেসব কাটিয়ে আমি চাইবো চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের প্রকৃত চর্চাকারীরা সেখানে সুযোগ পাবেন। ৬ ঘণ্টা অনেক বড় সময়। এ সময়ে সম্প্রচার করাও কঠিন। সুতরাং খালি টক-শো কিংবা গানের অনুষ্ঠান দেখালে তা একঘেঁয়ে মনে হবে। নানা বৈচিত্রময় অনুষ্ঠানের মাধ্যমে চট্টগ্রাম কেন্দ্র নতুন শিল্পী ও প্রতিভা সৃষ্টির একটি আঁতুড়ঘর হিসেবে গড়ে তোলা হোক।

তবে যাত্রার শুরুর মাত্র দু’সপ্তাহের মাথায় সিটিভি’র কার্যক্রম মূল্যায়ন করতে নারাজ কবি ও সাংবাদিক আবুল মোমেন। তিনি বলেন, সিটিভি সবেমাত্র যাত্রা শুরু করেছে। তাদের পরিকল্পনার বাস্তবায়ন দেখতে হলে খানিকটা সময় তাদের দেওয়া উচিত। কিন্তু ৬ ঘণ্টা সম্প্রচার যেহেতু চট্টগ্রামবাসীর দাবি ছিল সুতরাং এ দাবি পূরণের লক্ষ্যে মানসম্পন্ন অনুষ্ঠানের দিকে মনযোগী হতে হবে। সেজন্য দুটো জিনিসের প্রয়োজন রয়েছে। তা হলো- উপযুক্ত লোকবল ও রাজস্ব বাজেট বাড়ানো। কেননা যোগ্য ও প্রশিক্ষিত প্রযোজকের সংখ্যা না বাড়লে যেমন ভালো অনুষ্ঠান নির্মাণ হবে না তেমনি টাকার অভাবেও অনুষ্ঠান নির্মাণ থমকে যেতে পারে।

 

 

পাঠকের মন্তব্য [০]   |    [৩০২] বার পঠিত

মন্তব্য প্রদানের জন্য( সাইনইন) করুন । নতুন ইউজার হলে (নিবন্ধন ) করুন ।