প্রথম যন্ত্রণার ধ্যান মেঘদূত প্রথম পাঠ-ধ্যান



Bookmark and Share

ভুলে যাও তুমি দক্ষিণে ছিলে। ভুলে যাও তুমি উত্তরে ছিলে। ভুলে যাও তুমি প্রশ্নে ছিলে। ভুলে যাও তুমি জন্মেছিলে। তুমি এই আমার ভেতর। কোথাও ছিলে না আগে। জন্মাওনি কোথাও কোন আঁতুড়ঘরে। একলব্য বলোনি কথা কোন যুবকের সাথে। আমার সাথেই তোমার প্রথম কথোপকথন। প্রথম গান। তোমার অলিগলিতে হাঁটেনি কোন প্রেমিক, কোনকালে। আমার পদচিহ্ন দিয়েই তোমার প্রথম পথ-রচনা। কোনদিন স্পর্শ করনি শিশিরের শব্দ। আমার স্পর্শেই প্রথম শিহরিত হলে। না---কোনদিন হাঁটোনি তুমি কোথাও, কোন বারান্দায়। এখন দিব্যি হেঁটে বেড়াচ্ছো আমার শিরা-উপশিরায়। কোন স্বপ্নও ছিলো না তোমার পূর্বের পর্দায়। এখন করে যাচ্ছ স্বপ্নের চাষ। অনর্গল। প্রথম অধিকারে আমাকেই করেছো বশ। প্রথম কান্নায় আমাকেই করেছো কাতর। প্রথম চিৎকারে আমাকেই করেছো তাড়া। প্রথম প্রেমে আমাকেই করেছো অধিকতর স্বপ্নবাদী। প্রথম ফ্রেমে আমাকেই টাঙিয়েছো হৃদয়ে। আর এই প্রথম আমি হয়ে উঠি পূর্ণাঙ্গ প্রেমিক। তোমাকে ভালোবাসা ছাড়া, তোমার ভালোবাসা ছাড়া আমার নেই কোন গন্তব্য। এই প্রথম বুঝেছি সদ্য প্রসূত নারী মানেই মানচিত্র। জীবন পাঠের আরাধ্য ইতিহাস সমূহ। সদ্য ভূমিষ্ঠ কবিতার ন্যায়-গাঢ়-রোমাঞ্চকর। অন্ধকারে হাতড়াতে হাতড়াতে খুঁজে পাই কাঁচের গ্লাস। অর্ধেক প্রেম তার, অর্ধেক জল। তৃষ্ণার্ত আমি। গ্লাস ধরি হাতে। পান করি প্রেম। হয়ে উঠি আরো তৃষ্ণার্ত। এই প্রথম চিৎকার করে উঠি ভালোবাসি। প্রথম জ্ঞান আমার ভালোবাসার। তুমি। এই প্রথম, প্রথম স্পর্শে বদলায় অমার কল্পনার রং। লাল নীল রং আনন্দে। পুরোহিতের প্রথম পাঠের মতো ধ্যানমগ্নতা তোমার। তুমি কখনো আগে কারো ধ্যানে ছিলে না।

নতজানু হয়ে ছিলাম তখনো

এখনো যেমন আছি,

মাধুকরী হও নয়নমোহিনী

স্বপ্নের কাছাকাছি।


যখন ছিলে না তুমি উদভ্রান্ত রোদের আকাশে,

যখন ছিলে না তুমি সবুজ বনাঞ্চলে কাঠবিড়ালির

কাঙালিপনায়,

যখন ছিলে না, তখনো আমি পেয়েছি তোমাকে

তোমার না থাকা জুড়ে। দৃষ্টি পেরিয়ে স্বপ্ন

যেখানে হাতড়াই কোন এক বাঙালিয়া কিশোরীর

পথে, সব হয়ে উঠো কেবল তুমি। প্রথম তুমি।


দ্বিতীয় অধ্যায়-যন্ত্রণা

পূর্ণাঙ্গ চাঁদে গ্রহণ লেগেছে । গ্রাস করো তুমি সমস্ত আমাকে। সহসা আমাকে হারাই আমি। অদ্ভূত এক দাহে দৃষ্টি জ্বলে। সূচাগ্র স্বপ্নরা সময়ের হাতে দলিত। ভালো না থাকার তিক্ত সমীকরণ। বন্ধ জানালা গলে নেমে আসে আকাশের বেদনাক্ত নীল---নীল----নীল। অস্থির। কিংবা বিষণ্নতা। প্রথম তোমাকে এতো ভালোবাসার দুঃখ নদীতে ডুবতে থাকি। একা। প্রথম তোমাকে সাজাবার কাঙালিপনায় জ্বলতে থাকি। একা। ভীরুমন খাপছাড়া। দলছুট। পাঁজরে রক্তস্রোত। কবিতা নির্বাসিত। গল্প উদাসীন। কবি আশাহত। ময়ুর পেখমের আল্পনা রং ধুয়ে হয়ে উঠে জ্বলজ্বল অশ্রুকণা। দ্বিতীয় প্রহরের ক্লান্ত ভাবনায় প্রথম তোমার শূন্যতা। মর্মর ধ্বনি স্বপ্ন ভাঙার। তোমাকে পেয়ে হারানোর। বিহ্বল হয়ে উঠে পানশালা। নর্তকির মতো ধেই ধেই করে নাচে স্মৃতি। যে স্মৃতির সমস্ত ক্যানভাসে প্রথম তোমার অধিকার। নেশা আমার যাযাবর শিরায় মিশতে থাকে। নেশা আমার পলাতক ভাবনায় মিশতে থাকে। নেশা--নেশা--লাগে। হতচ্ছাড়া নদী বয়ে চলে অবিরল---অনন্ত। দুঃখ এসে কড়া নাড়ে-- “তুমি আছো? অস্পষ্ট জবানে, হ্যাঁ, বলে খিল খুলে দিই। দুঃখ ঢুকে ঘরের ভেতর। মনের ভেতর দুঃখ করে খেলা। বিছানা-বালিশ, বই-পত্তর, রং-প্লেট, পেন্সিল, ছাইদানি, পাপোশ...সবখানে তার সমানে দাপট। দুঃখ খেলে চোখের কোণে, অশ্রুকণায়। আমার নিঃসঙ্গতায়। বিরহের চলে দ্বিতীয় উল্লাস। তোমাকে বন্ধু পেয়ে হারানোর। তোমাকে সখি এত্তো ভালোবাসার। প্রেমে দুঃখবতী হৃদয় কাঁপে অহর্নিশি স্বপ্ন ধসের।

আমার হাঁটাচলায় অসম্ভব ক্লান্তি ভর করেছে,

আমার তাকানোতে অসম্ভব ক্লান্তি ভর করেছে,

আমার আধাশোয়া শরীরে ক্লান্তি ভর করেছে,

ঘুমহীন---নবজাতকের মতো হু হু করে কান্না।

আমার নির্লোভ কবিতাগুলো অপরাধীর মতো বন্দী হয়ে থাকে কালো কালির কলমের নিবে, ভূমিষ্ঠ হয় না তারা....স্বপ্ন-হতাশ ক্লান্ত পৃষ্ঠায়। আমার কাব্যচর্চায় অসম্ভব ক্লান্তি ভর করেছে, আমার প্রেমে, সুধায়, উড়নচণ্ডী ভাবনায় ভর করেছে ক্লান্তি। ক্লান্তি, ক্লান্তি, ক্লান্তি। আহ! বঞ্চিতের মতো ইথারে ভাসে প্রথম স্বপ্ন দেখার ইচ্ছে খেয়াল। তোমাকে পেয়ে হারানোর বিষক্রিয়ায় দিগম্বর হয়ে উঠে আমার সাজানো পৃথিবী। শূন্য, শূন্য, শূন্য।

চেনা শহরে যদি আঘাত হানে ঘূর্ণি-হাওয়া--লণ্ডভণ্ড শহরটাকে অচেনা লাগে, মনে হয় এ-শহর আমি চিনি না। যার তাপ চিনি, নাকের ডগায় লাল দাগ চিনি, হাসি বাঁকা ঠোঁট চিনি, পায়ের শব্দে উল্লাস সিঁড়ির ভাঁজ চিনি, চুলের বেণীর ফিতা চিনি...... সেই যে মানুষটাকে অচেনা লাগে। প্রথম যে আমার দক্ষিণে ছিলো, উত্তরে ছিলো, প্রশ্নেও ছিলো, যে জন্মছিলো প্রথম প্রেমে চূড়ান্ত শিহরণে, যে প্রথম হেঁটেছিলো অধিক স্বপ্নের ভেতর... সে বড় অচেনা হয়ে যায় সহসা। ঘামতে থাকি কেবল হৃদয়ের উত্তাপে। ক্লান্ত...ক্লান্ত। সেই তুমি ক্লান্তিময় চোখের তলে কালো দাগ হয়ে আছো আমার। ঘুমহীন রাতে সেই তুমি বেদনার শয্যা হয়ে আছো, সেই তুমি কবিতার পৃষ্ঠায় কাটাকাটি, সেই তুমি দুঃখ রোদের জ্বালা, অনন্ত পথ বন্ধুর। ধূসর পথচলা। ভালোবাসার সোহাগে অভিমান বেড়াজালে বন্দি পথিক হই আমি। দুঃস্বপ্নরা তাড়া করে। শান্তি নেই আর। ভালোবেসে একটা মানুষ কাঁদতে পারে গোপন ঘরে। ভালোবেসে কফিন বন্দি থাকতে পারে, শস্য ফসল ক্ষেতে একা একা অমাবস্যার রাত জাগানো পাখির মত ভাসতে পারে, উগ্র হতেও উগ্রতর মানুষ হয়ে ভাঙতে পারে বুকের পাঁজর, আমি.... আমি। আমিই পারি দুচোখ ভরে জল ডুবিয়ে প্রার্থনাতে মগ্ন হতে তোমার মঙ্গলে। দিগন্ত রেখায় মিশে যাওয়া আকাশ স্পর্শ করে উধাও হয়ে যেতে ইচ্ছে করে। ইচ্ছে করে-তোমাকে জোরপূর্বক কাছে টেনে বুকে বেঁধে রাখি, শান্তি নিই। পলাতক কিংবা আততায়ী হয়েও শান্তি পায়নি কোন ভালোবাসার মানুষ। তবে ভালোবাসায় শান্তি কোথায়? সখি, আমি তোমার মায়ামঙ্গল কামনায় শান্তির সন্ধান করি। ধ্যানমগ্ন পুরোহিতের মতো। কারো পানে তাকায় না আমার চক্ষুযুগল। ভয় পাই যুগল মানুষ দেখে, কিংবা অন্য যুবতী। ভয়ে থাকি ভালোবাসার বাদ্য বাজবে বলে। ভয়ে আছি সমস্ত রাস্তায়, নদীতে, নিজের ভেতর।

জঙ্গলে সে ভীষণ যেতো আবশ্যক

জঙ্গলে সে বাঘের পায়ের ছাপ দেখেছে।

লক্ষ্মীঠাকুর যেমন হাঁটেন উঠোন জুড়ে-

মানুষ ধুপের ধুনোর গন্ধে ভয় পেয়েছে

মানুষটি আজ মানুষ দেখে ভয় পেয়েছে।

(শক্তি চট্টোপাধ্যায়)

আজ আমি সেই মানুষ। প্রেমের কবিতায় ভয়, প্রেমের গানে কিংবা জলরঙে ভয় হয় পাছে আবার যদি প্রেম হয়? ধ্যানে তুমি তাই জেগে থাকো প্রেমের মতো। প্রথম ছিলে যেমন প্রেমে।




Bookmark and Share

line