(১) গ্লানি, দুঃখ, শোক, ক্ষোভ, প্রতিবাদ, প্রতিরোধ আর মুক্তির নিখাদ স্বাদের সম্মিলন, স্বাধীনতা। যাকে পেয়েছি-হারিয়েছি-আবার খুঁজছি। পেয়েও হারানোর বেদনায় ছুটে চলেছি, মাঝে মধ্যে নিজের উপস্থিতি জানান দিচ্ছি। ক্যানভাসার হয়ে মুক্তিযুদ্ধ-স্বাধীনতা, দেশপ্রেম, শহীদের রক্ত, ধর্ষিতা বোনের চিৎকার ভাড়া দিচ্ছি আগে আসলে আগে পাবেন ভিত্তিতে। এ আর এমন কী? মাত্র তো একটা দিন; একটা দিনের জন্য সব উল্টো পাল্টা হতেই পারে। দিন রাত মুখোশ এঁটে থাকা মানুষগুলো ঐ একটি দিন যখন মুখোশটা খুলে ফেলে তখন নিজেই নিজেকে চিনতে পারে না। সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের বক্তব্যের একাংশ উল্লেখ না করে পারছি না। বৃটিশ চেয়েছে এদেশটাকে লুটে পুটে চেটে খেয়ে নিঃশেষ করতে। পাকিস্তান চেয়েছে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে এদেশের মানুষকে পাক সারজমিন সাদ থিওরি গিলাবে তেতো কুইনাইনের মতো। পারেনি। তারা শেষ পর্যন্ত পাত্তারি গুটিয়ে পালিয়ে বেঁচেছে, কিন্তু তাদের চামচা বা এদেশীয় দোসররা ওঁত পেতে আছে, সময় লাগুক, একটু একটু করে এগিয়ে যাচ্ছে তারা। নব্য মুক্তিযোদ্ধার দাপটের কাছে হার মানতে বাধ্য হচ্ছে সেদিনকার তেজস্বী-বিদ্রোহী-অকুতোভয় লড়াকু মুক্তিযোদ্ধারা। একে কী নামে অভিহিত করা যায়, সময়ের ধারাবাহিকতা নাকি যুগের চাহিদা? জন্মের সুতীব্র চিৎকার নাকি মুক্তির হাহাকার?
(২) জাতি হিসেবে ৪০ হতে বছরখানেক বাকি আছে। বয়সেও আমাদের চারপাশে বিরুদ্ধতার চাবুকের শব্দ-‘শপাং শপং শপাং। বছরের পর বছর ধরে আমরা বিদ্রোহ বিপ্লবকে বাদ দিয়ে বিরোধ বিতর্ককে নিয়ে পড়ে আছি, জাবর কাটছি প্রতিনিয়ত। গরুর সামনের দিকটা আগে নাকি পেছনের দিকটা আগে জবাই করবো তা দীর্ঘ ৩৯ বছরেও সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি, গোশতও আর খাওয়া হয়নি। কারণ কী? জানা নেই। প্রতিকার কী? তা-ও জানি না। দেশের বিরাজিত ও বিতর্কিত বিষয় সম্পর্কে আমাদের সবক দেওয়ার জন্য কেউ নেই। লোকের অভাবটা টের পাচ্ছি, কিন্তু তেমন লোক তৈরির পথ খুঁজছি না, মনের অমিলটা সর্বক্ষেত্রে। তবে আর বড় বড় বুলি আওড়ে লাভ কী?
দেশে একটা কথা ‘প্রচলিত আছে-‘গাডে গাডে দেখা হয়, বোনে বোনে দেখা হয় না। জয়ের একটা ঝাঁঝ আছে। আগে যুদ্ধজয়ের পর সেনাপতিরা সেনাদের লুটতরাজ, ধর্ষণ ইত্যাদি শৃঙ্খলাভঙ্গ ধ্বংসাত্মক কাজের জন্য কয়েকদিন আস্কারা দিতেন। নির্দিষ্ট সময় পার হওয়ার পর কোন সৈন্য শৃঙ্খলা ভঙ্গ করলে দেখামাত্র তাকে গুলি করে নিরস্ত্র করা হতো। বাংলাদেশে একেকবার একেক সরকার আসে। স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত ডানপন্থী, মধ্যপন্থী, স্বৈরপন্থী, কতো পন্থীইতো এলো গেল। তারা সকলেই সেনাপতির প্রথম ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে দলীয় নেতা-কর্মীদের আস্কারা দেন। কিন্তু বাড়াবাড়ির পর্যায়ে তাদের লাগাম টেনে ধরার ক্ষেত্রে পুরোপুরি ব্যর্থতার পরিচয় দেন।
(৩) ক’দিন আগে এক পাগলের পাল্লায় পড়তে হয়েছিল, সবাই তাকে চাচা সম্বোধন করে। তার পাগলামির ধরণটা হলো, তিনি যা বলেন তা সকলকে মেনে নিতেই হবে। প্রতিবাদ করলে বিপদ। বিষয়টা জানা ছিল না আমার। তাই প্রধানমন্ত্রীর, মন্ত্রী, মেয়র, দেশ, সমাজ, জনগণ থেকে শুরু করে সকলকেই শাপ শাপান্ত করছেন এমনভাবে যে, এক সময় প্রতিবাদ করতে বাধ্য হলাম। আর যায় কোথায়? তেলে যেন পানি পড়লো। প্রশ্ন করেছিলাম আপনি যে সকলকে নিয়ে এসব কথা বলছেন, কতোটা শিওর আপনি? প্রমাদ গুণতে লাগলাম, আর তিনি বাজাতে লাগলেন ভাঙা রেকর্ড। ‘শিউর কচ্ছি মানে, যা দেখছি তাইতো কচ্ছি। কামাখা মিছা কওনের মানুষ আমি না। ফাঁক পাইলে দু’চাইর খান গুল মারি, তাও তোমরা শুনতি চাও বলি। এ দ্যাশের বেবাকত জানে আমি কয় লম্বর। আমিও জানি। তয় হে কতা মুখে আননের সাধ্য নাই কারো। যার যার ধান্দায় ব্যস্ত সবাই। আমার হিসেবে ভুল ধরিবার মানুষ ক’জন আছে? বুকে হাত দিয়া কওতো দেহি। পারবা না। তোমরার যা বুদ্ধি; আমার সামনে আওনের আগে বদনা লইয়া দুইবার টাট্টিখানায় ছুটতে হয়। আমার কামের সাক্ষী নাই। দ্যাশে মানুষ নাই। ছিল সবটে ছাগল, অহন বলদের ভেক ধইরা জাতে উঠবার চাও’।
(৪) যতোই পাগল, মাথা খারাপ বা উন্মাদ বলি না কেন, চাচার কথাগুলো অন্তরে ঝড় তোলে, উদ্ভ্রান্ত করে তুলে থেকে থেকে। মনের মধ্যে ডাহুক কাঁদে। ফিরে ফিরে আসে অতীত, ঝাপসা চোখে দেখি ব্যবচ্ছেদ হচ্ছে অতীত, ধর্ষিত হচ্ছে বাংলা প্রতিদিন। অন্যের দুঃখ নিজের মতো করে ভাগ করে নেয়াটাই নাকি মনুষ্যত্ব। কারো ব্যথায় সমব্যথী হলেই তবে ফুটে উঠে মানবিক মূল্যবোধ। অন্যের কষ্ট, দুর্ভোগ কিংবা ক্লান্তি মুছে দেয়ার নাম কি তবে উদারতা? এর কোনটিইতো পারছি না আমি। মানুষ্যত্ব জলাঞ্জলি দিয়ে হলেও আজ আমার উল্লাস করতে ইচ্ছে করছে। ফাঁসির দড়িতে ঝুলন্ত লাশগুলো দেখেও চোখে জলের লেশমাত্র নেই। তার চেয়ে বরং ঝুলন্ত লাশের গায়ে ছিটানোর জন্য একদলা থু থু জমা আছে মুখে। ৩৯ বছর ধরে শ্বাসকষ্টে ভুগছি আমি। তবু বেঁচে আছি, অপেক্ষায় আছি কখন ঐ লাশগুলো পচে গলে গন্ধ ছড়াবে, চারপাশে উৎসব করবে কাকের দল? আমি দেখতে চাই ক্ষুধার্ত নেড়ী কুকুর কামড় বসাচ্ছে লাশের মাংসল পাছায়, নর্দমার কীট শুষে নিচ্ছে লাশের গা থেকে সবটুকু রস। বেয়নেটের আগায় ছোট্ট শিশুর কলিজা গেঁথে যারা উল্লাস করেছিল, তাদের বুকে নিয়ে এ মাটি কখনো স্বস্তি পাবে না।
(৫) বড় সমস্যা জর্জর আমাদের এই দেশ, এখানে জীবিত থাকার নামই জীবন। এখানে ভরসার নেতারা আমাদের ধোঁকা দেন। এখানে প্রকৃতি নিয়ম করে আমাদের কাঁদায়। এখানে অনাচারই বিচারের প্রতিশব্দ। অথচ এটাও ঠিক যে, এদেশের মানুষের মনে অদ্ভুত এক স্বপ্নের ফেরিওয়ালা বাস করে। এদেশের অধিকাংশ মানুষ ক্ষুধা দারিদ্র্য-যন্ত্রণা-বঞ্চনাসহ অগুনতি নেতিবাচক দলন পেষণের মুখস্থ জীবনযাপনের মধ্যেও সুন্দরের স্বপ্নকে চিরটাকাল অতি যতনে লালন করে এসেছে। সে স্বপ্ন যখন দুঃস্বপ্ন করে দেয়ার চক্রান্ত চলে তখন সুন্দর হয়ে ওঠে অতৃপ্ত। বাংলাদেশের শুদ্ধতম গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামটি যে রকম রুদ্র মূর্তি ধারণ করেছে তাতে শঙ্কিত আমরা। আমরা চাঁদ সওদাগর দেশের মানুষ। লৌহবাসর নির্মাণ করেও পারিনি লক্ষ্মীন্দরকে রক্ষা করতে।
(৬) উল্টো রাজার উল্টো দেশ এটি। উল্টো পথে উল্টো রথে উল্টো বেশে চলতে গিয়ে দেরি তো একটু হবেই। স্বাধীনতার পর থেকে জাতি হিসেবে আমরা ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ছি। আসলে পিছিয়ে নয়, শব্দটা হবে পিছলে পড়ছি। এক পা এগোই, দুই পা পেছোই। যা শুরু করি তা শেষ করা হয় না। খাওয়া শুরু করতে না করতেই তৃপ্তির ঢেঁকুর ওঠার কারণে আমাদের সবকিছু শেষ না হতেই শেষ হয়ে যায়। তবুও একবার ভেবে দেখা যায়, প্রতিদিনের সংকীর্ণতা, তুচ্ছতার ঊর্ধ্বে, চিরায়ত মানবমন সম্প্রীতির আলোয় স্বাধীনতার রূপ, রস, লাবণ্য ও আনন্দকে নিয়ে প্রাণে প্রাণ মিলাতে পারে কিনা।
শুক্রবার। দিনটি ছুটির দিন হলেও পারিবারিক ও সামাজিক কর্মব্যস্ততায় ক্রমশঃ তা অন্যান্য ব্যস্ত দিনগুলো চেয়ে আরো বেশি ব্যস্তময় হয়ে উঠছে। সপ্তাহের আর ছয়টি দিনের ব্যস্ততা এক বা দ্বিমুখী হলেও বিভিন্ন কারণে এই দিনটির ব্যস্ততা বহুমুখী। তো বেশ দৌড়ঝাপ আর ছুটোছুটির মধ্য দিয়ে গেল শুক্রবারের ছুটির দিনটি। জুমার নামাজ ঠিক রেখে শেভ করা, নখ কাটা, পুরো সপ্তাহের জমানো কাপড় ধোয়া ও ইস্ত্রি করার মত ব্যক্তিগত রুটিন কাজ ছাড়াও অসুস্থ আত্মীয়কে দেখতে হাসপাতালে যাওয়া, টিউশনে যাওয়া বিয়ের নিয়ন্ত্রণে কোনটাই বাদ ছিল না। যাই হোক ব্যক্তিগত কাসুন্দি ঘেটে পাঠক আপনাকে বিরক্ত করব না। শুক্রবার বিভিন্ন জায়গায় যাওয়ার সুবাদে ছোট ছোট কিছু ঘটনার সংস্পর্শে আসার সুযোগ ঘটেছে। সুযোগ হয়েছে সম্পর্কের কিছু অদৃশ্য সুতোর বন্ধন পর্যবেক্ষণ করার। মনের কাগজে রেখাপাত করা সেইসব আঁকিবুকির কিছুটা ভাগ করে নিতেই কাগজ কলম হাতে তুলে নেওয়া।
অ.
নানী সম্পর্কের এক আত্মীয়া অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। বয়স হয়েছে, যে কোন সময় অঘটন ঘটে যেতে পারে। তাকে দেখতে চকবাজারের উদ্দেশ্যে টেম্পোতে চেপে বসলাম। ঈদগা থেকে এক সুন্দরী তরুণী ছোট ভাইকে নিয়ে টেম্পোতে উঠলেন। ছোট ভাইয়ের বয়স আনুমানিক আট-নয় বছর, মেয়েদের বয়স অনুমান করতে নেই (!) তাই অনুমান করার ঝামেলায় গেলাম না। যাই হোক, তরুণী ও তার ছোট ভাইয়ের গাড়িতে ওঠা ও বসার ধরণ দেখে মনে হল টেম্পোতে চলাচলে তারা ঠিক অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারেনি। ছোট ভাইটি স্বাভাবিক বসে থাকলেও তরুণী তার হাত-পা এমনভাবে জড়িয়ে ধরে রেখেছেন যে, দেখে মনে হচ্ছে ছোট ভাইটি যে কোন মুহূর্তে টুপ করে পড়ে যেতে পারে। পৃথিবীর তাবৎ ঝঞ্জা থেকে ভাইকে সুরক্ষা দেওয়ার প্রত্যয় যেন তরুণীর চোখে-মুখে খেলা করছে। ভাইয়ের প্রতি বোনের অকৃত্রিম ভালোবাসা অবলোকন করে সত্যিই মনটি ভরে গেল। সেই সাথে বড় ভাই বা বোন না থাকার পুরনো জ্বালা আরও একবার মনে উঁকি দিয়ে গেল। ভাইদের পাশেই বসেছিলেন বয়স্কা এক মহিলা। পরনে নিম্নবিত্ত পরিবারের ছাপ। কোলে চার-পাঁচ বছরের ছোট্ট একটি শিশু। শিশুটি সম্পর্কে মহিলার নাতি। মহিলা সম্ভবত নাতিকে নিয়ে গ্রাম থেকে শহরে বেড়াতে এসেছেন। নাতি ছেলেটি চোখ বড় বড় করে সবকিছু দেখেছিল। পথে তরুণী ও তার ছোট ভাই নেমে গেলে কন্ডাক্টরের দায়িত্বে নিয়োজিত ছেলেটি মহিলাকে সামনের দিকে সরে আসতে ইশারা করল। তা দেখে ছেলেটি ভাবল তাকে বুঝি নেমে যেতে বলা হয়েছে। দাদীর কোল ছেড়ে সে উঠতে যাবে এমন সময় গাড়ি চলতে শুরু করল হুমড়ি খেয়ে পড়ার অবস্থা হল। আতংকিত দাদী মুহূর্তেই নাতিকে সামলে নিলেন। অস্থির নাতিকে সুস্থির করতে কপট রাগ দেখিয়ে তার শীর্ণ হাত মুষ্টিবদ্ধ করে নাতির মুখের উপর তাক করে দেখালেন। গাড়িতে এক ছোট হাসির ঝড় বয়ে গেল। ঘটনার আকস্মিকতায় হতবিহবল নাতি লজ্জিত ভঙ্গিতে দাদীর গা ঘেঁষে চুপ করে বসে রইল। আহা দাদীর ভালোবাসা বুঝি এমনই হয়। আমার বাবা ছোটবেলায় বাবা-মা হারিয়েছেন। তাই আমার আর দাদা-দাদী দেখার সৌভাগ্য হয়ে ওঠেনি। দাদা-দাদীকে না দেখার এই দুঃখ হয়তো কোনদিন ঘুচবে না।
আ.
হাসপাতাল থেকে ফিরতে একটু দেরি হয়ে গেল। জুমার নামাজে স্থান হল একেবারে সবার শেষে বাচ্চা কাচ্চাদের সাথে। বাচ্চা কাচ্চারা অনেকের কাছে বিরক্তিকর! আমার অবশ্য তাদের সঙ্গ পেতে বেশ ভালোই লাগে। ভালো লাগে কারণ, ওরা বেশ ডায়নামিক! আমি যা পারি না অবলীলায় ওরা সে কাজটা করতে পারে। একটা উদাহরণ দেওয়া যাক, দুই রাকাত ফরজ নামাজ শেষে ইমাম সাহেব ঘোষণা দিলেন, “বাকি নামাজের শেষে মিলাদ হবে।” বাচ্চাদের মধ্যে অত্যধিক ডায়নামিক একজন বলে উঠল, “মিলাদের পর কি হবে?” তার চেয়েও বেশি ডায়নামিক একজনের উত্তর, “ব্যান্ড শো হবে ”! বাচ্চাদের আরেক দল গোল হয়ে বসে পড়াশোনা নিয়ে আড্ডা জমিয়ে ফেলল। তাদের মধ্যে সবচেয়ে লম্বা যে জন, সে সম্ভব তাদের দলনেতা। দলনেতা তার চেয়ে উচ্চতায় দুই ফুট কম একজনকে প্রশ্ন করল, “বলতো ক্যাট অর্থ কি?” উচ্চতায় কম মনে করেছে ক্যাপ বলা হয়েছে। সে ত্বরিত জবাব দিল, “টুপি”। দলনেতার নেতৃত্বে অন্যান্য সাঙ্গপাঙ্গদের সে কি হাসি। হাসছে উচ্চতায় কমও। ওদের বয়সে আমি মসজিদে মুরুব্বিদের বেতের ভয়ে টু শব্দ করতেও ভয় পেতাম। ওদের ডায়নামিক সাহস আর প্রাণ খোলা স্বতঃস্ফুর্ততায় আমি রীতিমত মুগ্ধ। আমাদের ডায়নামিক প্রজন্মকে ভালো লাগার আরেকটি কারণ হল তাদের বন্ধুবান্ধব সংখ্যা মাশাআল্লাহ অনেক। ছেলেবেলা থেকেই আমার বন্ধু বান্ধব খুব কম। এই বড়বেলায় এসেও আমার বন্ধু সংখ্যা গুনতে এক আঙুলের সবকটি কর প্রয়োজন হয় না! শুনেছি বন্ধু হতে হলে সুন্দর মন থাকা প্রয়োজন। অথচ এক জীবনে মানুষের সব প্রয়োজন চাহিদা অনুযায়ী পূরণ কি হয়। সত্যি, জীবন বড় বিচিত্র।
ই.
আমি যে বাসায় টিউশনে যাই তাদের এক ছেলে এক মেয়ে। মেয়েটিকে আমি ইংরেজি পড়াই। সে এবার এসএসসি দিচ্ছে। মেয়েটির বাবা প্রায়শই দেখি ছেলেকে নানা কারণে বকাবকি করছেন। ছেলেটি একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিকম অনার্স পড়ছে। এখন সে যথেষ্ট বড় হয়েছে, তারপরও বাবা সন্ধ্যায় বাইরে যাওয়া নিয়ে, কম্পিউটারে বসা নিয়ে, টিভি দেখা নিয়ে বকাঝকা করেন। এই নিয়ে বাবার বিরুদ্ধে মায়ের কাছে তার অনেক অভিযোগ। সেদিন আমার ছাত্রীটি টিভিতে হিন্দি সিরিয়াল দেখছিল। সেই বাবাকে দেখলাম মেয়েকে বেশ শান্ত ভঙ্গিমায় বলছেন, “এসব কি দেখ, ওরা কি বলে তুমি কী বোঝ? তোমার না কাল পরীক্ষা?” “আমি পড়া শেষ করে টিভি দেখতে বসেছি, বাকি পড়া টিভি দেখা শেষ করে পড়ব।” মেয়ের স্পষ্ট জবাবে বাবা আর কিছু বলেন না। একই কথা ছেলেটি বললে ভদ্রলোককে অন্য যুক্তি দাঁড় করাতে দেখেছি। মেয়ের প্রতি পিতৃস্নেহের কাছে অসহায় বাবাকে দেখে আমার খুব হাসি পেল, সেইসাথে কিছু পুরনো কথা মনে পড়ে গেল। সংসারে মেয়ের প্রতি বাবার আর ছেলের প্রতি মায়ের বিশেষ পক্ষপাত লক্ষ্য করা যায়। বাবার কাছে মেয়ের সাত খুন মাফ অথচ ছেলের পান থেকে চুন খসলেই যত বিপত্তি। একইভাবে মায়ের কাছে ছেলেরা একটু বেশি বেশি সুযোগ সুবিধা লাভ করে আর মেয়েকে শ্বশুর বাড়িতে পাঠানোর আগাম প্রস্তুতি হিসেবে গড়ে তোলা হয় সর্বংসহা হিসেবে। তবে সংসারে ছেলে বা মেয়ে কেউ যদি একমাত্র হয় তিনি বাবা-মা উভয়ের কলিজার টুকেরো (!) হিসেবে সর্বোচ্চ সুযোগ সুবিধা ভোগ করেন। আমার ক্ষেত্রে একই ঘটনা ঘটেছিল। আমাদের তিন ভাইবোনের পরিবারে বোন ছিল একমাত্র । তার ব্যাপারে বাবা-মা দু’জনই ছিল অতিরিক্ত মাত্রায় স্নেহকাতর। আর সবার বড় হিসেবে আমাকে সবকিছুতে ছাড় দেয়ার ছবক দেওয়া হত। রাগে, দুঃখে, ক্ষোভে আমার পিত্তি জ্বলে যেত তখন। “যেত” বলছি এই কারণে যে, চাইলেও এখন আর পিত্তি জ্বালানোর কোন উপায় নেই। ছোট বোনের বিয়ের পর আমাদের সদা হাস্যজ্জ্বল পরিবার এখন যেন সাহারা মরুভূমি। একসময় হাসির বন্যা বয়ে যেত যে ঘরে এখন সেখানে শুধুই আনন্দ উচ্ছ্বাসহীন নিস্তেজ নিস্তরঙ্গতা। বাবা-মার পক্ষপাত বেশি পেত বলে এক সময় হিংসা হলেও এখন ভাই হিসেবে একমাত্র বোনকে আরো বেশি ভালোবাসা দিতে না পারার যাতনা প্রতিনিয়ত কুরে কুরে খায়। মজার ব্যাপার হল, কেন জানি বিয়ের পর কন্যা সন্তানের মুখে প্রথম বাবা ডাক শোনার স্বপ্ন মনে ডালপালা বিস্তার করা শুরু করেছে। জগৎ সংসার সত্যিই এক অদ্ভুত রসায়নে গড়া। কোন রসে যে কে কখন জারিত হয় তা বোঝার সাধ্য হয়তো কারো নেই।

