রাষ্ট্রের ঐক্য এবং আমাদের স্বকীয়তা
ইয়াসিন আরাফাত

Bookmark and Share

ভাঙনের শব্দ শুনে আচানক ঘুম ভেঙেছে। চারপাশ চোখ বুলাই- সব ঠিক। তবে ভাঙনটা কোথায় হয়, মনে? হতে পারে। স্বাভাবিক ভাঙন খেলার শব্দ আমাকে এমন নাড়াবে কেন, আমি তো বুঝি এ তো জীবনেরই অংশ। আজ ঘুম ভাঙা রাতে বিষাদ আঁধার চোখে বিছানা ছেড়ে স্বজনদের নিথর দেহ খুঁজে বেড়াই। তাদের শান্তির, স্বস্তির ঘুম। নিজেকে একা মনে হয়, নিজের ভেতর নিঃসঙ্গতার বুনো ঝড় বয়ে চলছে যেন। কিছু ভালো লাগা তবু বুকে জাগে- কিছু মানুষ তো আমার কাছ থেকে আশা পাচ্ছে, সঙ্গ পাচ্ছে, স্বস্তি পাচ্ছে।

প্রতিটা মানুষের একান্ত জগৎ-এর একান্ত সংজ্ঞা থাকে। বড্ড বেশি নিজস্বতা নিয়ে একটি মানুষ বেড়ে উঠতে পারে, তবু ঐক্য শব্দটি তাদের জন্যও প্রাসঙ্গিক হয়ে যায়। বহিঃজগতে বিচিত্র অনুভবের বিচিত্র মানুষ ছড়িয়ে আছে। নিজের বৈচিত্রতা আর অন্যের বৈচিত্রতা সত্ত্বেও একটা ঐক্যের ভেতর মানুষকে বেঁচে থাকতে হয়। সফিস্টদের মতো একান্ত নৈতিকতার সিদ্ধান্ত দিয়ে বিশ্ব টিকতে পারবে না। নিজস্ব শব্দটির সংজ্ঞা এমন নয় যে- তোমরা যেটাকে পাপ বল সেটাকে আমি পাপ বলি না, তোমরা যেটাকে হত্যা বল তাকে আমি ভালোবাসা বলি। নিজস্বতার নির্মাণ হবে পারিপার্শ্বিক বিচারে। যে মনভূমি নিজস্ব চরাচর তার উপাদান গড়ে ওঠে পরিচিত এ বহিঃঅঙ্গন থেকে।

মানুষের নিজস্বতা, সমাজের নিজস্বতা, জাতি-বর্ণগত নিজস্বতা ইত্যাদির যোজনে একটি রাষ্ট্রের একিভূত হওয়া। এরপরে আসে রাষ্ট্রের নিজস্বতা। বর্তমান মুক্ত বিশ্বের ধারণার কালে এসব নিজস্বতার আদৌ প্রয়োজন আছে কিনা প্রশ্ন তোলা যেতে পারে। এ প্রশ্নের উত্তর নিজস্ব ধারণামতে দিলে দুটো উত্তর হয় এভাবে- প্রয়োজন আছে এবং প্রয়োজন নেই। দুটো দু’দিকের পথে হলেও দু’টোকেই গ্রহণযোগ্য মানতে হবে। ধরা যাক একটা জাতির নিজস্বতার প্রয়োজন আছে কি নেই এ প্রশ্ন তোলা হল। ব্যক্তিগত বিচারে বলি অতি রক্ষণশীলতা নিয়ে বা জাতির বিশুদ্ধতা চেয়ে দিনগুজরানো যাবে না এই সময়ে এসে। কোন জাতি সংখ্যাগরিষ্ঠ হলে সে চাইবে সংখ্যা লঘিষ্ঠের উপর তার সংস্কৃতি চাপিয়ে দিতে। এ অবস্থায় সংখ্যা লঘুর উদ্দেশ্য হওয়া উচিত ধীরে ধীরে লক্ষ্য পূরণ। সংখ্যা গরিষ্ঠের অর্থনীতিকে পুরাপুরি রপ্ত করে এবং সংস্কৃতিকে চলন উপযোগী ধারণ করে সামনে এগিয়ে যাওয়া। অর্থনৈতিক শক্তিতে বলিয়ান না হলে সংখ্যা গরিষ্ঠকেও তার স্বকীয়তা ধরে রাখতে কঠিন সংগ্রামে পড়তে হয়। টাটা বা আরো বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিক অনেকেই জরতুস্র ধর্মের। সংখ্যার বিচারে এ ধর্মধারী ক’জনই বা আছে কিন্তু তাদের অর্থনৈতিক শক্তির বলে ক্ষুদ্রতার দায় তাদের জন্য কাঁটা হয়ে ওঠেনি। মাস্তান ভাষার দাপটে যখন পৃথিবীর বহু ভাষা হুমকিতে পড়ে যাচ্ছে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে (ইংরেজি ভাষাকে ভেবে নিতে পারেন) সেখানে বেশ কিছু ভাষা দাঁড়িয়ে আছে স্বমহিমায় (চিনা ভাষা বা মান্দারিয়ান ভাষাকে উদাহরণে টানতে পারেন)। এটা সম্ভব হচ্ছে তাদের অর্থনৈতিক বলে।

রাষ্ট্রের ঐক্যের প্রসঙ্গে ফিরে আসি। জনঐক্য যত তীব্র সে দেশের সার্বভৌমত্বের ভিত ততই শক্ত (ইরানকে উদাহরণে টানা যেতে পারে)। বাংলাদেশের কত আর আয়তন। ক্ষুদ্র একটি রাষ্ট্রের একতা কত বেশি প্রয়োজন বলার অপেক্ষা রাখে না। ভাষা, জাতির দাবি তুলে কেউ যদি বিচ্ছিন্ন হবার দাবি তুলে তবে তা কখনোই মঙ্গলকর চিন্তা হবে না। সাংস্কৃতিক বৈচিত্রতা বুকে নিয়েও রাষ্ট্রের ঐক্যে যোগ দেয়া যায়। স্বকীয়তা টিকিয়ে রাখার যুদ্ধে যেমন আমরা সামিল হব তেমনি রাষ্ট্রের ঐক্যের জন্যও মাঠে নামব। ঐক্য না থাকলে বিশ্ব নিখিলের বৃহৎ-এ আমরা তো নাক ডুবিয়ে মরব।


Bookmark and Share

line