
ওদের সাথে ফেরা
লোকটি প্লেনের জানালার পাশে বসে অপলক তাকিয়ে আছে বাইরের দিকে। চোখে মুখে চরম হতাশা। ভাবলাম, প্রবাস জীবন থেকে দেশে ফিরছে। তারতো খুশি থাকারই কথা। কিন্তু কিসের বেদনাবোধ তাকে আচ্ছন্ন করে আছে? জানার কৌতূহল হলো। তার পাশের খালি সিটে বসে আলাপ জমানোর জন্য জিজ্ঞেস করলাম, ভাই আপনি কোন জেলার?
এখানে বলে রাখি, আমি ফিরছি আমেরিকা থেকে। আমাদের ফ্লাইট আবুধাবীতে যাত্রা বিরতি শেষে আবার যাত্রা শুরু করছে ঢাকার উদ্দেশ্যে। আবুধাবী থেকেই উঠেছে লোকটা। উঠেছে আরো অনেকেই। খেয়াল করে দেখলাম এরা সবাই বিমর্ষ। চোখে মুখে ভীষণ দুশ্চিন্তার ছাপ।
কথা বলতে গিয়েই লোকটির কথা আটকে গেল। চোখের কোণে জমল জল। কান্নাটাকে কোনরকমে দমিয়ে রেখে সে জানাল তার বাড়ি ময়মনসিংহে। জায়গা জমি বিক্রি করে সে এসেছিল আবুধাবীতে। কাজ নিয়েছিল একটি কনস্ট্রাকশন কোম্পানিতে। কিন্তু সেই কোম্পানি বন্ধ হয়ে গেছে। তাই পাঁচ শতাধিক শ্রমিককে দেশে ফেরত যেতে হচ্ছে। এই বিমানেই রয়েছে দেড় শতাধিক শ্রমিক যারা একই কোম্পানিতে কাজ করতো। বুঝলাম এরা সবাই পরস্পরের চেনা পরিচিত। সবারই সেই একই সমস্যা, একই দুর্ভাগ্য।
লোকটি জানাল, আবুধাবীতে এসেছিল দেড় বছর আগে।
তার ভাষায়, বাবার এক খন্ড জমি ছিল গ্রামে। সেটি বিক্রি করে টাকা যা পেয়েছিলাম সেই টাকায় এসেছিলাম বিদেশে। ভেবেছিলাম দীর্ঘ সময় বিদেশে থেকে টাকা রোজগার করবো কিন্তু...।
শুনে মন খারাপ হলো, প্রশ্ন করলাম। ফিরে যাচ্ছেন কেন? থেকে যেতেন? সে জানাল কোম্পানি সবাইকে প্লেনের টিকেট ধরিয়ে দিয়েছে। তাছাড়া পাসপোর্ট ছিল ওদের হাতে। পালিয়ে অন্য কোথাও কাজ পাওয়া সহজ ছিল না। তাই ঝুঁকি না নিয়ে সবাই দেশে ফিরে যাচ্ছে।
প্লেনের ভিতর ভীষণ নীরবতা। দু’একজন কাঁদছেন, হয়তো এই ভেবে দেশে গিয়ে কি করবেন। কি ভাবে আবার শুরু করবেন? সারা বিশ্বের মন্দার আঘাতটা শেষ দিকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশেও এসে পড়েছে। এরকম অনেক কোম্পানি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
ইতোমধ্যে ইত্তেহাদের ফ্লাইট এটেনডেন্ট দ্রুত হেঁটে সিট বেল্ট সবাই বেঁধেছেন কিনা তা চেক করতে শুরু করেছেন। অনেকেরই বেল্ট বাঁধতে অনীহা। একজন বলল, কি হবে বেল্ট বেঁধে? মরে গেলেই তো বেঁচে যাবো। দেশে কত মানুষ আমাদের মুখ চেয়ে বসে আছে। তাদের কি বলবো?
এক সময় রানওয়েতে প্লেন চলা শুরু করে। ফ্লাইটে ড্রিংকস সার্ভ শুরু হয়। সবাই কোক পেপসিতেই সীমাবদ্ধ। ট্রের ওপর রাখা বিয়ারের ক্যান কিংবা রেড ওয়াইন নিচ্ছে না কেউ। হঠাৎ পাশের লোকটি আমাকে জিজ্ঞেস করল। বিয়ার খাওয়া যাবে না? বললাম, অবশ্যই, চেয়ে নিন, ওগুলো তো আপনাদের জন্যই। সে বলল, ভাই কি বলব জানি না। তাই সাহস পাচ্ছি না। ভাবলাম কত নিরীহ, সহজ এই লোকগুলো। আমি ফ্লাইট এটেনডেন্টকে ডেকে বিষয়টা জানালাম। তিনি হাসি মুখে সিওর বলে লোকটির হাতে তুলে দিল বিয়ারের ক্যান। সাথে সাথে আশেপাশের অনেকের মনে থাকা ইচ্ছা দ্রুত প্রকাশ পেল। সবাই দাঁড়িয়ে চাইতে লাগল। আবুধাবী থেকে ঢাকা চার ঘণ্টার ফ্লাইটে সবারই অনেক প্রশ্ন।
একসময় বিমর্ষভাব কাটিয়ে এবং নীরবতার খোলস ভেঙে সবাই আলাপচারিতায় মগ্ন হলো। তখন মনে হল যাত্রা শুরুর সময় যে দুঃখবোধ ও চোখের কোণে পানি সব ক্ষণিকের জন্য উধাও। একটু পরই সবার হাতে হাতে পৌঁছে গেল এমবারকেশন ফর্ম। একটু ক্ষণ পরই আমার পাশের চার পাঁচজন হাত বাড়িয়ে দিল। ভাই আমারটা একটু পূরণ করে দিবেন। বললাম। অবশ্যই। একজন একজন করে দিতে হবে ফ্লাইট ল্যান্ড করা পর্যন্ত এটাতেই ব্যস্ত থাকলাম।
এয়ারপোর্ট ইমিগ্রেশনের লাইনে যখন দাঁড়ালাম তখন আমার সামনে দাঁড়ানো ঐ লোকগুলোর অনেকে আমাকে যেন টেনে নিতে চায় ওদের সামনে। কি আন্তরিক তাদের কৃতজ্ঞতাবোধ! বিনয়ের সাথে বললাম, থাক, আমি নিয়ম ভাঙতে চাই না। কিন্তু পাশের লাইনে প্রচণ্ড হৈ চৈ। কিছু আমেরিকা প্রবাসী ভীষণ চটে গেলেন ইমিগ্রেশন পুলিশের উপর। কারণ কিছু পুলিশ নাম ধরে ধরে কাউকে কাউকে লাইন থেকে ডেকে নিয়ে কাউন্টারের সামনে দাঁড় করিয়ে ইমিগ্রেশন প্রসেস ধরিয়ে দিচ্ছে। আর বাকিরা লাইনে দাঁড়িয়ে এ দৃশ্য দেখছে। এ ঘটনার প্রতিবাদেই চলছে এই হৈ চৈ। প্রবাসীরা বিদেশের নিয়ম দেখতে দেখতে অভ্যস্ত এই অনিয়ম তাদের মনে ক্ষোভের সৃষ্টি করে বৈকি! এই যে সামান্য সময় লাইনে দাঁড়ানো, তার জন্যও এখানে কেন হবে তদবির?

