
১.
আমারই তো বন্ধু তুমি। অতীতের জাহাজেরা কবে
গাংচিলের ডাক শুনে
লুব্ধ জলে সূর্য খুঁজে ডুবেছিলো, তুমি তা দ্যাখোনি
মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
তিনি বলতেন হাতে ব্যথা হতো, এক অজানা ধরনের ব্যথা। ব্যথাটা হাত থেকে বুকে যেতো। তারপর আশরীর ব্যাপ্ত করে সে ব্যথার শিকড় বিস্তার। শ্বাসকষ্টের উৎস বুকের যন্ত্রণা আর খুব ঘামতেন। তখন তাঁকে ইনজেকশন দিতে হতো, দিলে ঘণ্টা দু’তিন বাদে সুস্থ হতেন। ভদ্রলোক শোয়ার আগে দাঁতগুলো একটা বাটিতে রেখে দিতেন। তাঁর চিঠির একটা ছোটো অংশ : “লীলা, তোমাদের খবর পাই না অনেকদিন।... আমাদের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রাম বড় কম হচ্ছে। তার কারণ খতমের উপর বড় বেশি জোর পড়ে গিয়েছে। এটা বিচ্যুতি। এই বিচ্যুতি আমরা কাটিয়ে উঠছি। ...আমি একরকম আছি। ভালোবাসা নিও।” বাহাত্তরের চৌদ্দ জুলাই তিনি স্ত্রী লীলাকে এই চিঠি লেখেন। এই চিঠি-ই তাঁকে গ্রেফতার করার সূত্র হয়ে দাঁড়ালো। নকশাল আমলের বর্ষারাত বড়ো গভীর ও অতল! আমার সাথে তাঁর দেখা হয়েছিল কোনো এক বর্ষারাতে, ক্লিনশেভড ও পরিপাটি চুল তবুও চোখমুখ জুড়ে ক্লান্তি, মর্মের অনেক গহন থেকে উঠে আসা ক্লান্তি। একটা সাদামাটা টেবিলের উপর দু’কাপ ধোঁয়া ওঠা চা নিয়ে আমরা মুখোমুখি বসি। তিনি বিড়ি ধরালেন। তাঁকে আরো ক্লান্ত দেখাচ্ছিল। ‘কমরেড... শুরু করার আগে আমি একটু গলা ঝেড়ে নিই। ঐ চরাচরময় সাইলেন্সে আমার গলা ঝাড়ার শব্দ একটি তরঙ্গের সৃষ্টি করে, অকস্মাৎ তা উতরোল হয়-তাঁর শরীরময় দেখা দেয় ঘামের বিন্দু, তারা শরীর থেকে বিযুক্ত হয়ে ওড়াওড়ি করে, অতি দ্রুত সেই ঘামবিন্দুরা রক্তবর্ণ ধারণ করে, সেই ক্রমাগত বাড়তে থাকা ঝড়ের মধ্যে তাঁর শরীরও অদৃশ্য হয়, নষ্ট টেলিভিশন পর্দার বহু বর্ণিল বিন্দুর মতো তাঁর এই প্রস্থান-অমল তাঁর ডান হাতের আঙ্গুলগুলো আমার হাত ধরে, কেবল একটি শব্দ উচ্চারণ করে ‘ভালোবাসি’...তারও অনেক পরে, তালু ও সনখ আঙ্গুলসহ কব্জির নিচের হাতের অংশটুকু আমার সাথে রয়েই যায়-রক্তবর্ণ ঝড় থামার কোন কারণ নেই, ধীরে ধীরে একটি মৃদু সুগন্ধ আমার নাকে এসে লাগে। চেতনার তল থেকে ভেসে উঠি আমি। ঘুম ভাঙে। ধূপের গন্ধ ঘরময়, সুগন্ধ। মা ধূপ দিচ্ছেন আর মৃদু ঘণ্টাধ্বনি। আশপাশ থেকে আরো আরো শঙ্খ ধ্বনি। আমি ‘এবং জলাক’-এর চারু মজুমদার সংখ্যাটি সেলফে গুছিয়ে বেরিয়ে পড়ি।
২.
মা বলছিলেন-‘আমার সব সময়ই ভয় হয় ও যা-ই করুক বা যেখানেই যাক সে বোধহয় গুবলেট করে দেবে স্রেফ নিজের অব্যবস্থিত চিত্ত, বিচিত্র সব ধ্যানধারণা আর জীবনবীক্ষা দিয়ে।’ কোথায় যেন লিখেছিল ছেলেটা, ভিনসেন্ট ভ্যান গগ ‘ইট ইজ নট দ্যা ল্যাংগুয়েজ অব পেইন্টারস বাট দ্যা ল্যাংগুয়েজ অব নেচার হুইচ ওয়ান শুড লিসেন টু, দ্য ফিলিং-ফর দ্যা থিংস দেমসেলভস্, ফর রিয়ালিটি ইজ মোর ইম্পরট্যান্ট দ্যান দ্যা ফিলিং-ফর পিকচার্স।’ সে প্রায় সময় মাথা ঝুঁকিয়ে হাঁটতো, আক্ষরিক অর্থেই জানতো না জীবনে আনন্দ কাকে বলে! যদিও সেই না জানা আনন্দের পূর্ণ ব্যথায় রূপান্তরণ ঢেলে দিয়েছিলো তার ছবির উজ্জ্বল হলুদে; আঠারোশো তিপ্পান্ন’র ত্রিশে মার্চ জন্মানোর পর থেকে আঠারোশো নব্বইয়ের সাতাশ জুলাই আত্মহত্যার চেষ্টা ও একদিন পর ঊনত্রিশে মৃত্যু- এই পুরো সাঁইত্রিশ বছর ভিনসেন্ট একটা ঘোরের জীবন কাটিয়ে গেলো। মৃত্যুর আগের বছর আঁকা দিগন্ত বিস্তীর্ণ সাইপ্রেস বৃক্ষ তলে দুই তরুণী দাঁড়িয়ে থাকা সয়েল পেইন্টিংটিতে কি অসম্ভব গাঢ় রঙের ব্যবহার দেখো পূর্বা; দূরে পাহাড়- উইন্ডমিলের ঝাপসা অবয়ব, হলুদ ক্ষেতে কৃষকের চাষ করা কিংবা সূর্যাস্তদৃশ্যের গাঢ় আকাশে সটান দাঁড়িয়ে থাকা পাইন গাছেরা, টাক পড়ে যাওয়া- মুখ ঢেকে রাখা দুঃখী, চেয়ারে বসে থাকা বুড়ো লোকটার কথা মনে আছে মলিন বুটপরা? পূর্বা, দুঃখের বর্ণিল আভা বড়ো অলীক, জানো না তুমি তা, কেবল পবিত্র দুঃখীরা দেখে? ফুটপাতের অবোধ শিশুদের চোখের মণি মাঝে মাঝে ঐ আভা দেখে হাসে। ওগো মানুষ, তোমার হাতের উপর যে আমার তপ্ত জলের ফোঁটা পড়লো তা কি বেদনার বর্ণ নয়? ক্লান্ত এক পোকার কথা ভাবি, টিকটিকি তাকে খেতে আসছে দেখেও ক্লান্তির কারণে সে সরে যায় না আর টিকটিকি সে কি কখনো ভাবে না তার অতিকায় পূর্ব পুরুষের কথা? পূর্বা, জীবনানন্দের ‘নিরুপম যাত্রা’ উপন্যাসটা পড়ো তবে হয়তো কিছুটা বুঝে উঠতেও পারো নাগরিক মানুষের সংশয়দীর্ণ ব্যথা। আরে কি অদ্ভুত তাই না! ব্যথা পায় তবু ভাবে ব্যথা পায় কিনা!!
৩.
‘হত্যা’ আর ‘প্রেম’ জীবনের শব্দসমূহের মধ্যে বিপজ্জনক দুটি শব্দ। এই শব্দ দুটি আক্রান্ত করে মানুষের স্নায়ুমন্ডলী। মানুষের অসহায় হয়ে যাওয়া মনুষ্যত্বেরই অবমাননা। মানুষের না থাকা মানুষের পাশে। সারা সপ্তাহ ধরে চেতন অবচেতন জুড়ে কান্নার আবহ। ঢাকা, চট্টগ্রাম, জামালপুরে চারজন কমবয়সী ছাত্র স্রেফ নেই হয়ে গেলো। আর ‘ইতি’, তুমি? বাবা মা হীন জীবনের বিবর্ণতা আর যৎসামান্য যার রং সঞ্চয়ে ছিলো তা-ও হারাবে রাষ্ট্রীয় অপঘাতে। এখন মাঝে মাঝে মনে হয় অপঘাতে মৃত্যুর মত জন্মও সত্য। না, ইতি-তুমিও বিচার পাবে না। সৌমেন-তুমিও। বিচার না-পাওয়ার নিয়তি নির্ধারণে তোমরা এক...জীবন ও মৃত্যুকে এইভাবে রাষ্ট্র এক করে দেয়। ক্রসফায়ার তো সন্ত্রাসী মারবে, সুযোগমতন দু-দশজন বিপ্লবীকেও-যারা খেতে পায় না বলে হাতে অস্ত্র তুলে নেয় তারাও অভুক্ত মরে যাবে রাষ্ট্র আয়োজনে। আচ্ছা, একটা বুলেটের দামে কি একটা লোক পেট পুরে ভাত খেতে পারে? আর কত ছায়া আদালত? ঐ আদালতে যুদ্ধাপরাধীর বিচার বিচার খেলা আর কতো কাল? ‘বিশদ বাঙলা’-য় অনিল বাবুকে বলছিলাম একদিন, ‘আপনি একটা জিনিস খেয়াল করেছেন? রাজাকারদের ফিজিক্যাল স্ট্যাবিলিটি মুক্তিযোদ্ধাদের চেয়ে ভালো-এই জিনিসটা খেয়াল করেছেন যে ওরা কী চমৎকার শিরদাঁড়া সোজা করে হাঁটে ও দম্ভ ছড়ায় বাংলা জুড়ে?’ তিনি খানিক চুপ থেকে বলেন, ‘রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা...’ অনেক সময় ধরে চুপ থাকেন। অনুজকে কি বলবেন বুঝতে পারেন না। তিনিও তো এই দেশ দেখতে চান না। তিনিও তো জানেন, রাষ্ট্রীয় অপদার্থতায় মুক্তিযোদ্ধারা বঞ্চিত, ক্লান্ত, হাহাকারময় তাঁদের জীবন, যুদ্ধ স্মৃতিকে মনে হয় অসহ ভার; রণক্ষেত্রে না থেকেও অনেকে পরিণত হচ্ছে যোদ্ধায়-এই সব দেখতে দেখতে তাঁরা বিরক্ত...আমরা চুপ করে থাকি...সময় বয়ে যেতে থাকে... কোথা থেকে এক প্রজাপতি উড়ে এসে বসে মাটির পুতুলের উপর। তার কি মানুষজন্ম মনে পড়ে গেছে... আমরা জানি না.. আমরা পরস্পরের নীরবতায় আচ্ছন্ন থাকি, রাষ্ট্রও আচ্ছন্ন থাকে...

